চৈতন্য পূর্ববর্তী যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈষ্ণব গীতিকার মিথিলার কবি বিদ্যাপতি। তবে বিদ্যাপতির খ্যাতি মূলত ‘কবি’ হিসেবে হলেও শুধু এই কবি পরিচয়টুকু দিলে তাঁর সম্পর্কে প্রায় কিছুই বলা হয় না। নিজের সময় কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত মানুষ ছিলেন বিদ্যাপতি। নানা বিষয়ে তাঁর অসামান্য পাণ্ডিত্যের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর রচিত গ্রন্থগুলি থেকে। কবির সুদীর্ঘ জীবন ও নানা অভিজ্ঞতা, বহু বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। এই সমস্ত কিছুর সমন্বয়ে আমাদের বিদ্যাপতিকে চিনতে হবে।

বংশপরিচয়

বিদ্যাপতির জীবন কথায় প্রবেশে করার আগে তাঁর বংশপরিচয় সম্পর্কে দু-চার কথা বলা প্রয়োজন। তবে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হল – বিদ্যাপতির সমসময়ে মিথিলা কিংবা অন্যান্য অনেক অঞ্চলের কবিরা এবং গ্রন্থকারেরা নিজেদের গ্রন্থের শেষে কিংবা কাব্যের ভণিতায় নিজেদের পূর্বপুরুষের এবং মাতা-পিতার সম্পর্কে অল্প-বিস্তর লিখে গেছেন। ব্যতিক্রম বিদ্যাপতি। তিনি তাঁর কোনো গ্রন্থে অথবা কোনো পদে নিজের বংশ সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। ১৮৮৫ সালে Indian Antiquary তে একটি দানপত্রের তাম্রলিপি প্রকাশিত হয় যাতে লেখা হয়েছে যে, মিথিলার রাজা শিবসিংহ বিদ্যাপতিকে বিসপী গ্রামখানি দান করছেন। কিন্তু আশ্চর্য এই যে সেই দান পত্রটিতে পর্যন্ত বিদ্যাপতির পিতামাতা কিংবা বংশপরিচয়ের কোনো উল্লেখ নেই। এর ফল যা দাঁড়িয়েছে তা হল – মৈথিল কবির পরিচয় বা জীবন কথা সম্পর্কে লোকমুখে প্রচলিত কাহিনী কিংবা অনুমানের তালিকা এতই দীর্ঘ হয়ে গেছে যে তার সম্পূর্ণটা এখানে তুলে ধরাও অসম্ভব। উদাহরণ হিসেবে ঊনবিংশ শতাব্দীর বেশ কয়েকজন ঐতিহাসিকের মতামত তুলে ধরা যেতে পারে। ১৮৭৩ সালের Indian Antiquary তে জন্ বীম্স্ লিখেছেন – বিদ্যাপতির আসল নাম বসন্ত রায়। তাঁর পিতার নাম নাকি ভবানন্দ রায়। তাঁরা জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং তাঁদের বাসস্থান ছিল যশোহর জেলার বর্ণাটোরে, কিন্তু ১৮৮২ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ ১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় পণ্ডিত রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় একটি নিবন্ধ প্রকাশ করলেন, যেখানে তিনি প্রাণ করলেন যে বিদ্যাপতি এবং তাঁর পূর্বপূরুষ সকলেই মিথিলার বাসিন্দা ছিলেন এবং বিদ্যাপতি ছিলেন মিথিলার রাজা শিবসিংহের সভাসদ। রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের যুক্তি জন্ বীম্স্-ও মেনে নেন। ১৮৮১ সালে স্যার জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন অনুসন্ধান করে বিদ্যাপতি রচিত কবিতা সংগ্রহ করেন এবং মিথিলায় বিদ্যাপতির পূর্বপুরুষদের নামও অনুসন্ধান করে বের করেন। বিদ্যাপতির ঊর্ধ্বতন সাত পুরুষ এবং অধস্তন দ্বাদশ পুরুষের নাম গ্রিয়ার্সন প্রকাশও করেন তাঁর নামক Maithil Chrestomathy নামক গ্রন্থে। পণ্ডিত বিমানবিহারী মজুমদার গ্রিয়ার্সন এবং অন্যান্য গবেষকদের মত পর্যালোচনা করে বিদ্যাপতির পূর্বপুরুদের একটি বংশতালিকাও প্রকাশ করেছেন তাঁর গ্রন্থে –

বিদ্যাপতির বংশ পরিচয়

প্রসঙ্গত জানাই, বিদ্যাপতির পারিবারিক পদবি (Surname) ছিল ঠক্কুর। এই ‘ঠক্কুর’ শব্দই পরবর্তীসময়ে ঠাকুর পদবিতে রূপান্তরিত হয়েছে কিনা, তা ভাষাতাত্ত্বিকদের গবেষণার বিষয়। বিদ্যাপতি জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন।

বিদ্যাপতির পূর্বপুরুষ বীরেশ্বর, গণেশ্বর, চণ্ডেশ্বর প্রমুখরা মিথিলার রাজসভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন বলে জানা যায়। পণ্ডিতরা সেযুগের মিথিলার ইতিহাস উদ্ধার করে বিদ্যাপতির পূর্বপুরুষদের রাজসভার গুরুত্বপূর্ণ পদে মন্ত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা বিশদে আলোচনা করেছেন। পণ্ডিত বিমানবিহারী মজুমদারও সেই ইতিহাস উদ্ধার করেছেন তাঁর বিদ্যাপতির পদাবলী নামক গ্রন্থের ভূমিকায়। এঁদের সকলের প্রতিষ্ঠা, পাণ্ডিত্য, ঐশ্বর্য্যের কথা আলোচনা করে পণ্ডিত মজুমদার জানাচ্ছেন – ‘‘বিদ্যাপতির প্রপিতামহ ধীরেশ্বরের ভ্রাতারা বিপুল ঐশ্বর্য্য, প্রভুত্ব ও পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। তাঁহারা প্রচুর দানধ্যান করিয়াছেন, বড় বড় আট্টালিকা বানাইয়াছেন; আবার মিথিলার সমাজ সংগঠনের জন্য স্মৃতির প্রামাণ্য গ্রন্থ্ও লিখিয়াছেন। কিন্তু বিদ্যাপতির প্রপিতামহ ধীরেশ্বর পণ্ডিত হইলেও উচ্চ রাজপদের অধিকারী ছিলেন না। ধীরেশ্বরের পুত্র ও বিদ্যাপতির পিতামহ জয়দত্তও পাণ্ডিত্যে বা পদমর্যাদায় বৈশিষ্ট্য অর্জন করিতে পারেন নাই। জয়দত্তর পুত্র ও বিদ্যাপতির পিতা গণপতিকে অনেকে ‘গঙ্গাভক্তিতরঙ্গিণীর’ লেখক গণপতি হইতে অভিন্ন মনে করিয়াছিলেন। কিন্তু উক্ত গ্রন্থাকার গণপতি তিন জায়গায় বিদ্যাপতির মত প্রমাণরূপে উদ্ধৃত করিয়াছেন; এবং গ্রন্থের শেষে নিজেকে শ্রীযোগীশ্বর সম্ভব বলিয়াছেন। সুতরাং ইনি বিদ্যাপতির পিতা হইতে পারেন না। মিথিলার পঞ্জী সম্বন্ধে পারদর্শী পণ্ডিত শ্রীযুক্ত রামনাথ ঝাও এই মত পোষণ করেন। বিদ্যাপতির বৃ্দ্ধ প্রপিতামহ বড়লোক হইলেও প্রপিতামহ, পিতামহ ও পিতা বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করিতে পারেন নাই। আত্মসম্মান সম্বন্ধে সচেতন, অপেক্ষাকৃত দরিদ্র বুদ্ধিজীবী ব্যক্তি বড়লোক আত্মীয়ের পরিচয় দিতে চাহেন না বলিয়াই কি বিদ্যাপতির কোন গ্রন্থে ও পদে দেবাদিত্য, বীরেশ্বর, গণেশ্বর, চণ্ডেশ্বর, গোবিন্দদত্ত, বামদত্ত প্রভৃতি খ্যাতিমান ও প্রভূত ঐশ্বর্য্যশালী ব্যক্তির সহিত তাঁহার নিজের সম্বন্ধের কথা উল্লেখ করেন নাই ? (বিদ্যাপতির পদাবলী, বিমানবিহারী মজুমদার)

বিদ্যাপতির সময়কাল

বংশপরিচয়ের মতোই বিদ্যাপতির জন্ম কিংবা জীবনকাল নিয়েও পণ্ডিত-ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্যের অন্ত নেই। বিভিন্ন পণ্ডিত-ঐতিহাসিক বিভিন্ন সময়ে বিদ্যাপতির জন্মকাল সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পরিবেশন করেছেন। যেমন –
• সারদাচরণ মিত্র মত প্রকাশ করেছেন যে, খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বিদ্যাপতি জন্মগ্রহণ করেন। (বিদ্যাপতির পদাবলী, সারদাচরণ মিত্র, ১৮৭৮)
• পণ্ডিত গ্রিয়ার্সন এর মত এইরকম – “Bidyapati flourished and was a celebrated author during at least the first half of the 15th century. (পুরুষপরীক্ষা, গ্রিয়ার্সন, ভূমিকা দ্রষ্টব্য)
• নগেন্দ্রনাথ গুপ্তের মত অনুযায়ী ১৩৫৮ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাপতি জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৪৪৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়। (বিদ্যাপতি, নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত)
• মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মত প্রকাশ করেছেন – ১৩৪৭ থেকে ১৪৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে বিদ্যাপতি বর্তমান ছিলেন। (কীর্তিলতা, ভূমিকা দ্রষ্টব্য)
• কুমার গঙ্গানন্দ সিংহ তাঁর ‘বিদ্যাপতি কি পদাবলী’ গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন যে ১৩৫0 খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাপতি জন্মগ্রহণ করেন।
• পণ্ডিত বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে বিদ্যাপতি ১৩৭২ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৪৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন। (Journal of the Department of Letters, vol. XVI, Calcutta University )
• সতীশচন্দ্র রায়ের (দ্র. পদকল্পতরু) মতে ১৩৮0 খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাপতির জন্ম হয়।
• পণ্ডিত শহীদুল্লাহের মতে মোটামুটি ১৩৯০ থেকে ১৪৯০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বিদ্যাপতি জীবিত ছিলেন। (Indian Historical Quarterly, September, 1944)
• মহামহোপাধ্যায় ড. উমেশ মিশ্র এবং শিবনন্দন ঠাকুর মতপ্রকাশ করেছেন যে বিদ্যাপতির জন্ম হয় ২৪১ লক্ষ্মণ সম্বৎ-এ অর্থাৎ ১৩৬0 খ্রীষ্টাব্দে। ৩২৭ লক্ষ্মণ সম্বৎ অর্থাৎ ১৪৪৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়।
• ড. জয়কান্ত মিশ্রের মতে বিদ্যাপতি ১৩৬0 খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৪৩৭ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। (দ্র. History of Maithili Literature)
• পণ্ডিত দীনেশচন্দ্র সেন মন্তব্য করেছেন যে, মোটামুটি ১৩৫৮ খ্রিস্টাব্দে কিংবা তার কিছু আগে পরে বিদ্যাপতি জন্মগ্রহণ করে থাকবেন।
• পণ্ডিত অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ মোটামুটি ১৩৫0 খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বিদ্যাপতির জন্ম হয়েছিল বলে মনে করেন।
• খগেন্দ্রনাথ মিত্র মহাশয় বিদ্যাপতির জন্ম সালটিকে টেনে নিয়ে গেছেন চুতর্দশ শতকের একেবারে শেষ পর্যায়ে। ‘বৈষ্ণব রসসাহিত্য’ নামক একখানি গ্রন্থে তিনি লিখেছেন – ‘‘বিদ্যাপতির জন্ম যদি ১৩৯০ খ্রিস্টাব্দ বলিয়া ধরা যায়, তাহা হইলে তরুণ বয়সে তাঁহার বিসপীপ্রাপ্তি (২৯৩ ল.সং /১৪১২ খ্রি. অ.), ভাগবতের নকল ও পরিণত বয়সে ‘দুর্গাভক্তি তরঙ্গিনী’ লেখা – এই সকলের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য রক্ষা করা সহজ হয়।
• ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মত প্রকাশ করেছেন যে, বিদ্যাপতি মোটামুটি চতুর্দ্দশ শতাব্দীর শেষে অথবা পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে জন্মগ্রহণ করেন।
• ড. সুকুমার সেনের মতে, ১৪৬0 খ্রিস্টাব্দের পর বিদ্যাপতি আর বেশিদিন জীবিত ছিলেন না বলেই মনে হয়। তবে বিদ্যাপতির জন্ম কতসালে হয়েছিল এ বিষয়ে ড. সেন নিজস্ব কোনো মতামত দেননি।
• পরিশেষে ড. বিমানবিহারী মজুমদারের মন্তব্যটি আলোচনা করব। তিনি তাঁর বিদ্যাপতির পদাবলী গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন যে, ১৩৮0 খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি কোনো সময়ে বিদ্যাপতি জন্মগ্রহণ করেন। তবে নির্দিষ্ট কোনো সাল তিনি উল্লেখ করেননি। নেপালের রাজদরবার থেকে হলায়ুধ মিশ্রের ‘‘ব্রাহ্মণসর্বস্ব’’ গ্রন্থের একখানি প্রতিলিপি পাওয়া যায়। এই পুঁথির লিপিকার পুষ্পিকায় লিখছেন – ‘‘পক্ষে সিতেহসৌ শশিবেদরামযুক্তে নবম্যাং নৃপলক্ষ্মণাব্দে অর্থাৎ ৩৪১ লক্ষ্মণ সম্বতে, ১৪৬0 খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থের লিপিকার শ্রীরূপধর ‘‘সপ্রক্রিয়সদুপাধ্যায়’’ নিজকুল কুমুদিনীর চন্দ্রস্বরূপ প্রতিপক্ষের নিকট সিংহস্বরূপ, সচ্চরিত্র ও পবিত্র পণ্ডিত শ্রীবিদ্যাপতি মহাশয়ের নিকট অধ্যয়ন করিতেন।।’’
ড. মজুমদার এই পুঁথির লিপিকরের পরিবেশিত তথ্যের প্রমাণে মত প্রকাশ করেছেন যে, ১৪৬0 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত যে বিদ্যাপতি জীবিত ছিলেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ১৪৬0 সালের পর বিদ্যাপতি কতদিন পর্যন্ত জীবিত ছিলেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্যপ্রমাণ মেলেনা। ড.মজুমদার‍ও এ সম্বন্ধে কোনো মন্তব্য করেননি।
এই সমস্ত মতামত থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, বিদ্যাপতির জীবনকাল বা সে সংক্রান্ত সন-তারিখ সম্পর্কে গবেষকরা কেউই একমত হতে পারেননি। তবে মোটামুটিভাবে চতুর্দশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত কিংবা পঞ্চদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের‍ও কিছুকুল বিদ্যাপতি যে জীবিত ছিলেন –এ বিষয়ে প্রায় সকলেই একমত। তবে যুক্তিসঙ্গত তথ্যপ্রমাণ বিচার করে ড. অসিত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরও অনেকে ড. বিমানবিহারী মজুমদারের মতটিকেই অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেছেন। আমরাও এই মতটিকেই প্রামাণ্য বলে ধরে নিয়ে পরবর্তী আলোচনায় যাব।

জীবনী

অতিজনপ্রিয় কবির জীবনকথা অনেক সময় জনপ্রিয়তার উল্লাসেই হারিয়ে যায়। জনগণের কল্পনা কবিকে নিয়ে নানা গল্প তৈরি করে। কবির জীবন সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ চাপা পড়ে যায় সেই গল্পগুজব জনশ্রুতির আড়ালে। বিদ্যাপতির জীবনকথাও লোকশ্রুতির চাপেই তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়েছে বহুকাল আগেই। প্রধান লক্ষণীয় বিষয় এই যে, বিদ্যাপতির পদাবলী মিথিলা থেকে বঙ্গদেশ পর্যন্ত এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল এবং বিভিন্ন প্রদেশের ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য যেমন বাংলা শব্দ ইত্যাদি সেই পদসমূহের মধ্যে প্রবেশ করে কিংবা বিদ্যাপতির নাম ব্যবহার করে রচিত অন্য কবির পদ প্রচলিত হওয়ায় বিদ্যাপতি যে আদতে মিথিলাবাসী এবং তিনি যে মৈথিল ভাষাতেই পদ রচনা করেছেন চিরকাল, এক অক্ষরও বাংলা যে তিনি কখনও লেখেননি – এই ধারণাটাই বহুকাল পর্যন্ত মানুষের ছিল না। মোটামুটি ১৮৭৫ সালের আগে পর্যন্ত এতথ্যই সঠিকভাবে কারও জানা ছিল না যে বিদ্যাপতি মিথিলার অধিবাসী ছিলেন। জন বীম্‌স্ বিদ্যাপতির পদাবলীকে মৈথিলী লক্ষণাক্রান্ত বলে মত প্রকাশ করলেও বিদ্যাপতি যে মিথিলাবাসী –এমনটা তিনি ভাবনা পর্যন্ত করেননি। উপরন্তু যশোর নিবাসী জনৈক বসন্তরায়কে বিদ্যাপতি বলে বর্ণনা করেছেন তিনি। ঐতিহাসিক রাজকষ্ণ মুখোপাধ্যায় (বঙ্গ দর্শন, ১৮৭৫) এবং গ্রিয়ার্সনের গবেষণা থেকে বিদ্যাপতির জীবন সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তৎসত্ত্বেও কবির সম্পূর্ণ জীবনী রচনা করা যেতে পারে – এমন সময়সারণী বা তথ্যপঞ্জী এখনও পর্যন্ত আমাদের হাতে নেই। কবি নিজেও নিজের জীবন সম্পর্কে কোনো তথ্য তাঁর কোনো গ্রন্থে উল্লেখ করেননি। মিথিলার রাজপঞ্জীতে সামান্য যে তথ্য পাওয়া যায় এবং প্রচলিত কাহিনী থেকেই বিদ্যাপতির জীবনকথা পূণনির্মাণ করার চেষ্টা করতে হবে।
রাজা শিবসিংহ বিদ্যাপতিকে যে বিসপী গ্রাম দান করেছিলেন বলে তাম্রলিপিতে উল্লেখ আছে, সেই বিসপী গ্রামই কবির জন্মস্থান। উত্তর মিথিলার দ্বারভাঙ্গা জেলার (মধুবনী পরগণার) অন্তর্গত এই বিসপী গ্রাম। বিদ্যাপতির বংশপরিচয় অলোচনা করতে গিয়ে আমরা বিদ্যাপতির প্রপিতামহ বীরেশ্বরের নাম উল্লেখ করেছি। বীরেশ্বর নিজের অন্যান্য ভাইদের মতো রাজসভার মন্ত্রীপদের আকাক্ষা না রেখে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের চিরন্তন বৃত্তি যজন-যাজন অধ্যয়ন-অধ্যাপনাতেই নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন। বিদ্যাপতির পিতামহ জয়দত্ত এবং পিতা গণপতিও বীরেশ্বরের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। ফলে জ্ঞাতিদের মতো রাজপদের মর্য্যাদা বা ঐশ্বর্য্য কোনোটাই বিদ্যাপতির পরিবারের ছিল না – এমনটাই বেশিরভাগ পণ্ডিতের মত, তবে প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী বিদ্যাপতির পিতা গণপতি ঠাকুর মিথিলার রাজসভায় সভাপণ্ডিত ছিলেন। বিদ্যাপতির মায়ের নাম হাসিনী দেবী ছিল বলে কোনা কোনো ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছেন। তবে এর বিপক্ষমত যাঁরা পোষণ করেন, তাঁদের মতে হাসিনী দেবী বিদ্যাপতির মাতা নন, বিদ্যাপতির পৃষ্ঠপোষক মিথিলাধিপতি শিবসিংহের মাতা ছিলেন। এর প্রমাণ হিসেবে বিদ্যাপতি রচিত মিথিলায় প্রচলিত একটি পদের ভণিতা উদ্ধার করেন তাঁরা-

বিদ্যাপতি কবিবর এহো গাওল
জাচক জনকে গতী।
হাসিনি দেই পতি গরুড়নারায়ণ
দেবসিংহ নরপতি।।

কথিত আছে, বিদ্যাপতিরা বংশ পরম্পরায় পরমভক্ত শৈব ছিলেন। বিদ্যাপতির পিতা গণপতি ঠাকুর কপিলেশ্বর শিবের উপাসনা করে তাঁরই প্রসাদে বিদ্যাপতির মতো প্রতিভাধর পুত্রসন্তান লাভ করেছিলেন। বিদ্যাপতির বাল্যকাল সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী বিদ্যাপতি মিথিলার প্রসিদ্ধ পণ্ডিত হরিমিশ্রের কাছে বিদ্যাশিক্ষা করেন। বিদ্যাপতির ঘনিষ্ঠ বন্ধু পযাধর মিশ্রও তাঁর সহাধ্যায়ী ছিলেন।
বিদ্যাপতির জীবন-জীবিকা-ভাগ্য-এ সবকিছু অনেকটাই চালিত হয়েছে মিথিলার রাজসিংহাসনের ইতিহাসদ্বারা। ফলে বিদ্যাপতির জীবন আলোচনা করতে গেলে সে যুগের মিথিলার ইতিহাস এসে পড়বে- এটাই খুব স্বাভাবিক। লক্ষণীয়, বিদ্যাপতির জীবনের ইতিহাস পূণনির্মাণের ক্ষেত্রেও মিথিলার রাজদরবার থেকে প্রাপ্ত নথিই আমাদের অন্যতম প্রধান সহায়।
বিদ্যাপতির পিতা গণপতিঠাকুর যে সময় মিথিলার সভাপণ্ডিত ছিলেন – সেটা রাজা গণেশ্বরের রাজত্বকাল – এমনটা অনেকে ধারণা করেন। তাঁদের মতে ১৩৫0 সালের কাছাকাছি কোনো সময়ে বিদ্যাপতির জন্ম হয়ে থাকবে এবং ১৩৬১-১৩৬২ খ্রি. নাগাদ যখন রাজা গণেশ্বর প্রয়াত হন তখন বিদ্যাপতির বয়স ১0-১১। বালক বিদ্যাপতি এই সময় পিতার সঙ্গে মিথিলার রাজসভায় যেতেন। তবে জানিয়ে রাখি, বিদ্যাপতির সম্পর্কে পরিবেশিত সমস্ত তথ্যই অনুমান নির্ভর। ফলে এর মধ্যে কোনওটাকেই অভ্রান্ত বলে ধরে নেবার কোনো কারণ নেই। প্রসঙ্গত পণ্ডিত বিমানবিহারী মজুমদার এই মতের বিরোধিতাই করেছেন।
যাই হোক, গণেশ্বরের পর তাঁর পুত্র কীর্তিসিংহ রাজা হলেন। তবে গণেশ্বরের মৃত্যুর পর কীর্তিসিংহের রাজ্যলাভ খুব সহজে ঘটেনি। জনৈক মুসলমান শাসক অস্‌লানের হাতে গণেশ্বর নিহত হয়েছিলেন। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর তিন পুত্র বীরসিংহ, কীর্তিসিংহ এবং রাঅসিংহ রাজ্যচ্যুত এবং নির্বাসিত হলেন। এঁদের মধ্যে রাঅসিংহ মাকে নিয়ে মিথিলায় রইলেন, বীরসিংহ এবং কীর্তিসিংহ জৌনপুরের ইব্রাহিম শাহের শরণাপন্ন হলেন রাজ্যপুনরুদ্বারের আশায়। বেশ কিছুকাল পর দুই ভাইকে নিয়ে ইব্রাহিম মিথিলা আক্রমণ করলেন, রাজ্য পুনরুদ্ধার হওয়ার পর কীর্তিসিংহ রাহপদে অধিষ্ঠিত হলেন। অচিরেই কীর্তি সিংহের রাজসভায় স্থান লাভ করলেন বিদ্যাপতি। কীর্তিসিংহের বীরত্ব এবং রাজ্যপুনরুদ্ধারের কাহিনী অবলম্বনে তিনি রচনা করলেন কীর্তিলতা। ‘কীর্তিলতা’ কীর্তিসিংহের রাজত্বকালেই সমাপ্ত হয়েছিল। ‘কীর্তিলতা’ রচনার কালে হিসাব মতো কবির বয়স যথেষ্টই কম, কিন্তু এই অল্প বয়সেই কবি হিসেবে বিদ্যাপতির খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল – তা বেশ বোঝা যায়, বিদ্যাপতি এই কাব্য রচনাকালে নিজেই নিজেকে ‘খেলন কবি’ বলেছেন – ভাবটা এই যে এই কাব্যের লেখক এমনই একজন অল্পবয়স্ক কবি যাঁর এখনও খেলাধুলার বয়স যায়নি।
কীর্তিসিংহের পর দেবসিংহ রাজা হলেন, বৃদ্ধ রাজা দেবসিংহ নামেই রাজা ছিলেন, শাসন সংক্রান্ত সমস্ত দায় দায়িত্বই ছিল তাঁর যুবক পুত্র যুবরাজ শিবসিংহর ওপর। শিবসিংহ নিজের সুশাসনের গুণে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন যে দেবসিংহের জীবদ্দশাতেই তিনি ‘রাজা’ বলে সম্বোধিত হতেন, প্রজারা তাঁকে রাজার মতোই মানত। বিদ্যাপতির সঙ্গে রাজা শিবসিংহের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং শিবসিংহের অন্তিমকাল পর্যন্ত বিদ্যাপতি তাঁর সভায় বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী ছিলেন। বিদ্যাপতি রচিত বৈষ্ণব পদাবলী বা রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক পদের বেশিরভাগই এই সময়কালের মধ্যে রচিত হয়েছিল, আমরা আগেও উল্লেখ করেছি যে বিদ্যাপতির পৃষ্ঠপোষক রাজা শিবসিংহ বিদ্যাপতিকে তাঁর জন্মস্থান ‘বিসপী’ গ্রামখানি ভূসম্পত্তি হিসেব দান করেছিলেন।তবে এই দানপত্রটি আসল না নকল – এ বিষয়ে বৃটিশ শাসনকালে তুমুল বাদানুবাদ হয়। বিদ্যাপতির বংশধররা যে তাম্রশাসনের প্রমাণে বিসপী গ্রামের সত্ত্ব ভোগ করতেন সেটিকে পণ্ডিত গ্রিয়ার্সন জাল বলে মন্তব্য করেন এবং গ্রামটি যাতে বৃটিশ সরকারের রাজস্ব আদায়ের অধিকারে আসে – তার পক্ষেই সওয়াল করেন। তবে মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে এই দানের বৃত্তান্তটি জাল নয়, আসল, এর স্বপক্ষে প্রমাণ হিসেবে শাস্ত্রী মশায় বিদ্যাপতির সমকালীন প্রতিদ্বন্দ্বী কেশব মিশ্রের একটি মন্তব্য তুলে ধরেছেন। কেশব মিশ্র বিদ্যাপতিকে ‘‘অতিলুব্ধ নগর যাচক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর কটাক্ষ যে বিদ্যাপতির ‘বিসপী’ গ্রামের সত্ত্বলাভের দিকেই – সেটিই শাস্ত্রী মশায় উল্লেখ করেছেন, তবে পণ্ডিত সারদাচরণ মিত্র এই দানপত্র সম্পর্কে যে মন্তব্যটা করেছেন তার ভাষা যেমন সরস তেমনই দানপত্রের আসল – নকল সংক্রান্ত বিতর্কে একটা মোটামুটি ধারণাও এর থেকে পাওয়া যায়। আমরা পাঠকের সুবিধার জন্য সেটুকু উদ্ধৃত করে দিলাম –
রাজা শিবসিংহ রাজপণ্ডিত কবি বিদ্যাপতিকে বিসপী গ্রাম দান করেন। সেই দানপত্রের যে তাম্রলিপি বিদ্যমান আছে সেখানি কৃত্রিম প্রমাণিত প্রমাণিত হইয়াছে। ডাক্তার গ্রিয়ার্সন উহাকে জাল বলিয়াছেন। এ কথাটা ভাল করিয়া বুঝিয়া দেখিতে হইবে। তাম্রলিপি জাল বলিলে এরূপ অর্থ হইতে পারে যে, শিবসিংহ বিদ্যাপতিকে আদৌ গ্রাম দান করেন নাই, জাল দানপত্রের বলে বিদ্যাপতি ঠাকুর ও তাঁহার বংশধরগণ উক্ত গ্রাম ভোগদখল করিয়া আসিতেছিলেন। অথবা বিদ্যাপতি স্বয়ং এমন কর্ম্ম করেন নাই, তাঁহার বংশধরেরা এইরূপ করিয়া আসিতেছিলেন। দলিল জাল করিয়া যে একখানা গ্রাম চুরী করা যায় এ কথা কিছু নূতন রকমের। প্রসিদ্ধ আমেরিকান লেখক মার্ক টোয়েন যখন ভারতবর্ষে আগমন করেন তখন হাতি দেখিয়া তাঁহার বড় লোভ হইয়াছিল, কারণ ওই জানোয়ারটা তাঁহাদের দেশে বড় একটা দেখিতে পাওয়া যায় না। মার্ক টোয়েন লিখিলেন যে যখন তিনি দেখিলেন হাতীর কাছে কেহ নাই তখন তিনি এদিক ওদিক দেখিতে লাগিলেন, নিকটে পাহারাওয়ালা আছে কি না, কারণ হাতীটা চুরী করিবার ইচ্ছা বড় প্রবল হইয়াছিল; একবার চুরী করিতে পারিলে হাতী লইয়া পলায়ন করা নিতান্ত সহজ। এমন রসিক লোকও আছেন যাঁহাদের বিবেচনায় একটা হাতীর অপেক্ষা একখানা গ্রাম চুরী করা আরও সহজ। প্রকৃত কথা এই যে,মূল দানপত্রখানি নাই। তাম্রলিপিখানি বিদ্যাপতির কোন বংশধর প্রস্তুত করাইয়া থাকিবেন, লিপিকরের অতিরিক্ত বুদ্ধিতে প্রমাদ ঘটে। হিন্দু, মুসলমান, ইংরাজ দান সম্বন্ধে কোন সন্দেহ করেন নাই। তবে ষাট বৎসরের অধিক হইল গ্রাম আর ব্রহ্মোত্তর নাই। সে ঘটনা কবিশ্বর চন্দ্র ঝা কর্ত্তৃক সম্পাদিত পুরুষপরীক্ষা গ্রন্থে বিবৃত আছে। সন ১২৫৭ সালে দরভঙ্গা জেলার জমির বন্দোবস্ত হয়। সেই সময় কোন ব্যক্তি বন্দোবস্তবিভাগ সংবাদ দেয় যে বিদ্যাপতি ঠাকুর সিদ্ধপুরুষ, গ্রাম ও ধনের তাঁহারা কোন প্রয়োজন ছিল না। ভৈয়া ঠাকুর বিদ্যাপতির বংশধর বলিয়া পরিচয় দিয়া গ্রাম ভোগ করিতেছে। তখন বিদ্যাপতির বংশধর ভৈয়া ঠাকুর বর্ত্তমান। তদারকের সময় ভৈয়া ঠাকুর তাম্রপত্র ও বংশাবলী পেশ করেন ও দখল প্রমাণ করেন। পঞ্জীকারগণ ও অপর অনেক লোক তাঁহার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। তাহারা কহে, বিসপী গ্রাম বিদ্যাপতি ঠাকুরের লাখেরাজ ব্রহ্মোত্তর, তাঁহার বংশধরেরা ভূমি কর না দিয়া বরাবর ভোগ করিয়া আসিতেছেন। আদালতে পণ্ডিত বিদ্যাকর মিশ্র স্বয়ং এই কথা বলিলেন। সাহেব সনদের তর্জ্জমা শুনিতে চাহিলেন। দানপত্রে এই শ্লোকটি আছে –

গ্রামে গৃহ্নন্ত্যমুষ্মিন্ কিমপি নৃপতয়ো হিন্দবোন্যেতুরুস্কা
গো কোল স্বাত্মমাংসৈ সসহিত মনুদিনং ভুঞ্জতে তে স্বধর্ম্মম্।

যে সকল হিন্দু বা মুসলমান নৃপতি উক্ত হইতে কিছু আদায় করিবেন তাঁহারা (যথাক্রমে) গো এবং শূকরের মাংসের সহিত স্বধর্ম্ম ভোজন করিবেন।
শুনিয়া ইংরাজ কহিলেন, গো এবং শূকর উভয় মাংসই আমাদের ভক্ষ্য, অতএব এই শপথ লঙ্ঘন করিলে আমাদের কোন দোষ হইবে না। গ্রাম রাজা শিবসিংহর প্রদত্ত, বাদশাহের নয়, সুতরাং খাজনা নির্দ্ধারিত হইবে।
বিসপী গ্রাম এখন আর বিদ্যাপতির বংশধরদিগের নাই, হস্তান্তরিত হইয়াছে।
শিবসিংহের রাজত্বকালটিই মোটামুটি বিদ্যাপতির জীবনকালের‍ও স্বর্ণযুগ। বিদ্যাপতির রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক পদগুলিতে বহুবার রাজা শিবসিংহের নাম ভণিতায় উল্লিখিত হয়েছে। পণ্ডিত –ঐতিহাসিকরা ধারণা করেন যে, রাজা শিবসিংহ কাব্যরসের অত্যন্ত মর্মজ্ঞ বোদ্ধা ছিলেন। বিদ্যাপতির পদে শিবসিংহের পাশাপাশি যার নাম বহুবার এসেছে –তিনি রাজা শিবসিংহের প্রিয় পত্নী লখিমা দেবী। মিথিলার প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী, বিদ্যাপতি রচিত এইসব পদ রাজ অন্তঃপুরের গায়িকাদের দ্বারা বিভিন্ন রাগ এবং তালে গীত হত এবং রাজা রাণী একত্রে বসে এর রস আস্বাদন করতেন। রাজা শিবসিংহের সম্পর্কে জনশ্রুতি এইরকম যে, তিনি শুধু কাব্য-সঙ্গীতের সমঝদার ছিলেন তাই নয়, তিনি বীর যোদ্ধাও ছিলেন। তিনি মুসলমান শাসকের অধীনস্থ করদ রাজ্যের রাজা ছিলেন। কোনো একসময় জনৈক মুসলমান রাজা মিথিলা আক্রমণ করেন। লোকমুখে প্রচলিত কাহিনী এইরকম যে, শিবসিংহ নিজেই দিল্লীতে কর প্রেরণ বন্ধ করে এই বিপদ ডেকে এনেছিলেন। যাই হোক, শিবসিংহ তখনও যুবরাজ । বৃদ্ধ রাজা দেবসিংহই তখনও সিংহাসনে আসীন। দিল্লীর অধীনস্থ সেনার হাতে শিবসিংহ বন্দি হলেন। শান্তিপ্রিয় বৃদ্ধ রাজা দেবসিংহ দিল্লীর অধীনতা স্বীকার করে নিলেন ঠিকই, কিন্তু পুত্রকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে পারলেন না। শিবসিংহ দিল্লীর কারাগারে রইলেন।
এদিকে শিবসিংহের অনুপস্থিতিতে বৃদ্ধ রাজা দেবসিংহ যুবরাণী লখিমা দেবী সকলেই অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়লেন। তা দেখে বিদ্যাপতি নিজে দিল্লীর দরবারে গেলেন এবং সুলতানের কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে শিবসিংহের মুক্তি প্রার্থনা করলেন। বিদ্যাপতির কবি-প্রতিভার কথা শুনে সুলতান বললেন – বেশ, তাহলে এমন কাব্য রচনা করো, যাতে যা চোখের সামনে নেই তাও তোমার বর্ণনায় এমন সজীব হয়ে ওঠে যেন মনে হয় যে চোখের সামনে আছে। সুলতান বিদ্যাপতিকে একজন সদ্যস্নাতা রমণীর সৌন্দর্য্য কাব্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে বললেন। বিদ্যাপতি রচনা করলেন –

কামিনী করএ সনানে।
হেরি তহি হৃদয় হনএ পচবানে।

সুলতান বিশেষ সন্তুষ্ট হলেন না। তাঁর আদেশে এবার বিদ্যাপতিকে একটা কাঠের সিন্দুকে বন্ধ করে দেওয়া হল। বিদ্যাপতি শুদ্ধ সেই সিন্দুক এবার ঝুলিয়ে দেওয়া হল একটা কুয়োর ওপর। তারপর সুলতানের আদেশে বাইরে একজন রমণীকে রাখা হল যিনি ফুঁ দিয়ে উনুনে আগুন ধরানোর চেষ্টা করছেন। এবার সুলতান সিন্দুকে বন্দি বিদ্যাপতিকে বাইরের সেই রমণীকে নিয়ে কাব্য রচনা করতে বললেন। বিদ্যাপতি গাইলেন –

সজনি নিহুরি ফুকু আগি।
তোহর কমল ভ্রমর মোর দেখল
মদন উঠল জাগি।
জো তোহে ভামিনি ভবন জএবহ
ঐবহ কোনহ বেলা।
জৌ এহি সকট সৌ জিব বাঁচত
হোয়ত লোচন মেলা।।

এইবার সুলতান অত্যন্ত প্রসন্ন হলেন। বিদ্যাপতিকে যথেষ্ট সমাদর তো করলেনই, শিবসিংহকেও মুক্তি দিলেন সসম্মানে। দেবসিংহের জীবিদ্দশা পর্যন্ত শিবসিংহ দীর্ঘকাল যুবরাজ পদে থেকেই রাজত্ব করেছেন। মিথিলার রাজদরবারে প্রাপ্ত-পঞ্জী অনুযায়ী ২৯৩ লক্ষ্মণাব্দে রাজা দেবসিংহের মৃত্যু হয়। রাজা দেবসিংহের মৃত্যুর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দিল্লীর সুলতান গৌড়বঙ্গের নবাবের সঙ্গে মিলিত হয়ে মথুরা অবরোধ করেন। ফলে পিতার অন্ত্যেষ্ঠিক্রিয়া সম্পন্ন হবার আগেই শিবসিংহকে যুদ্ধের প্রস্তুতিও শুরু করতে হয়। তবে এই কঠিন সময়েও শিবসিংহ এই যুদ্ধে জয়লাভ করেন এবং মিথিলা নিজের অধিকারে রাখতে সমর্থও হন। মূলত শিবসিংহের দাম্পত্য জীবন এবং এই যুদ্ধজয়ের ঘটনাটিই বিদ্যাপতির ‘কীর্তিপতাকা’ নামক গ্রন্থের মূল উপজীব্য।
যাই হোক, যুদ্ধজয়ের পর শিবসিংহ রাজপদে অধিষ্ঠিত হলেন। যুবরাজ হিসেবেও দীর্ঘদিন ধরে তিনিই রাজ্য শাসন করেছেন, রাজোচিত মর্যাদাও ভোগ করেছেন কিন্তু এইটাই তাঁর অনুষ্ঠানিক রাজ্যাভিষেক। এই রাজ্যাভিষেকের পর পরই শিবসিংহ বিদ্যাপতিকে ‘বিসপী’ গ্রাম দান করেন। তবে শিবসিংহ বেশিদিন রাজত্ব করতে পারেননি। দিল্লীর সুলতানকে পরাস্ত করে তিনি মিথিলা নিজের অধিকারে রেখেছিলেন ঠিকই কিন্তু শিবসিংহের রাজ্যাভিষেকের তিন বা সাড়ে তিন বছরের মাথায় দিল্লীর সুলতান আবার বিশাল ফৌজ নিয়ে মিথিলা আক্রমণ করলেন। কিন্তু রাজা শিবসিংহ দিল্লীর সুলতানের বশ্যতা স্বীকার করতে সম্মত ছিলেন না। যুদ্ধ আসন্ন দেখে তিনি রাণীদের, বিদ্যাপতি এবং আরও দু-একজন বিশ্বস্ত অনুচরকে পাঠিয়ে দিলেন মিত্ররাজা পুরাদিত্যের আশ্রয়ে। বর্তমান নেপাল তরাই অঞ্চলের ‘রাজাবনৌলি’-তে পুরাদিত্য রাজত্ব করতেন। বিদ্যাপতি এবং রাজপরিবারের সকলকে পুরাদিত্যের আশ্রয়ে রেখে শিবসিংহ যুদ্ধে গেলেন। প্রচলিত কাহিনী থেকে জানা যায় যে, এরপর শিবসিংহ মিথিলার সেনা নিয়ে দিল্লীর সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। দিল্লীর সৈন্যবাহিনীর ব্যূহ ভেদ করে সুলতানের খুব কাছে পৌঁছে যান এবং তরবারির আঘাতে সুলতানের শিরস্থান খুলে নিয়ে শিবসিংহ ব্যূহ থেকে বেরিয়ে আসেন। দিল্লীর সুলতানও শিবসিংহের এই বীরত্বে মুগ্ধ হলেন। তিনি শিবসিংহের সঙ্গে যুদ্ধে বিরতিও ঘোষণা করলেন।
এদিকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নেপালের জঙ্গলের পথে শিবসিংহ নিরুদ্দেশ হয়ে যান। তারপর আর কখনোই তিনি ফিরে আসেননি। তাঁর মৃত্যু কবে কোথায় কীভাবে হয়েছিল এবিষয়েও সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।
এদিকে শিবসিংহ নিরুদ্দেশ হবার পরেও বেশ কিছুকাল পর্যন্ত তাঁর পত্নী লখিমাদেবী, সভাকবি বিদ্যাপতি প্রমুখরা নেপালে রাজা পুরাদিত্যের আশ্রয়েই রয়ে গিয়েছিলেন বলে বোঝা যায়। এই সময়ে রাজা পুরাদিত্যের আদেশে বিদ্যাপতি ‘লিখনাবলী’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন।
শিবসিংহের পর মিথিলায় শিবসিংহের ভাই পদ্মসিংহ রাজা হলেন। পদ্মসিংহের পত্নী ছিলেন রাণী বিশ্বাসদেবী। বিদ্যাপতি নিজেই নিজের গ্রন্থে বহু প্রশংসা করে উল্লেখ করেছেন যে, রাণী বিশ্বাসদেবী শুধু যে সাহিত্যের বা সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন – তা নয়, তিনি অসামান্য বিদূষীও ছিলেন। পদ্মসিংহ এবং বিশ্বাসদেবীর রাজত্বকালে বিদ্যাপতি আবার নেপাল থেকে মিথিলায় এসে প্রতিষ্ঠিত হন। তবে নেপালে বিদ্যাপতি প্রায় দশ বছর ছিলেন বলে মনে হয় কারণ এই সময়কালের মধ্যে তিনি নিজের হাতে সম্পূর্ণ ভাগবত পুরাণ লিপিবদ্ধ করেন। এই পুথির শেষে অস্পষ্ট অক্ষরে লেখা আছে যে ৩0৯ লক্ষ্মণাব্দে পুরাদিত্যের রাজধানী রাজবনৌলিতেই ভাগবত পুরাণ লিখন সমাপ্ত হয়।
যাই হোক, মিথিলায় ফিরে পদ্মসিংহের সভায় বসে বিদ্যাপতি প্রায় ২0৬টি পদ রচনা করেন। এছাড়াও রাণী বিশ্বাসদেবীর আদেশে ‘শৈবসর্বস্বসার’ এবং ‘গঙ্গাবাক্যাবলী’ নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। রাজা পদ্মসিংহের উত্তরাধিকারী ছিলেন নরসিংহ, মতান্তরে হরিসিংহ। এঁর সভাতেও আমরা বিদ্যাপতিকে উপস্থিত থাকতে দেখি। রাজা নরসিংহের আদেশে বিদ্যাপতি ‘বিভাগসার’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। রাণী ধীরমতির আদেশে রচনা করেন ‘দানবাক্যাবলী’ নামক গ্রন্থ। নরসিংহের পুত্র ধীরসিংহের রাজত্বকালেও বিদ্যাপতি জীবিত ছিলেন বলে জানা যায়। ধীরসিংহের রাজত্বকালে ভৈরবসিংহর আদেশে বিদ্যাপতি রচনা করেন ‘‘দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী’’। দুর্গাভক্তি তরঙ্গিণীই সম্ভবত বিদ্যাপতি রচিত শেষ গ্রন্থ। অবশ্য জীবদ্দশায় বিদ্যাপতি আর‍ও বেশ কিছু সংখ্যক কৃষ্ণ এবং শিবের প্রতি ভক্তিমূলক পদ রচনা করেছিলেন। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, পণ্ডিত বিমানবিহারী মজুমদারের মতে বিদ্যাপতি ১৪৬0 সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। পণ্ডিত মজুমদার এই মতের স্বপক্ষে যুক্তিও দিয়েছেন যথেষ্ট। তবে ঠিক কত সালে, কত বয়সে কীভাবে বিদ্যাপতির মৃত্যু হয় তা আজও অজানা।
বিদ্যাপতি নিজের গ্রন্থে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কথা বিশেষ কিছু লেখেননি। প্রচলিত কাহিনীসূত্র থেকে জানা যায় যে, বিদ্যাপতির দুই পত্নী ছিলেন। প্রথম পক্ষে বিদ্যাপতির হরপতি এবং নরপতি নামে দুই পুত্র হয়। দ্বিতীয় পক্ষে একটি পুত্র এবং একটি কন্যা । পুত্রের নাম বাচস্পতি, কন্যার নাম দুল্লাহা। বিদ্যাপতির কোনো পুত্রবধূ, যাঁর নাম চন্দ্রকলা নাকি কবি ছিলেন – এমন জনশ্রুতিও আছে।